ঢাকা ০৯:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনি ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগী

  • থিম বিক্রয়
  • প্রকাশিত সময় ০৩:৩৯:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১১৭ সময় দেখুন
111

আমাদের দেশে একটি বহুলপ্রচলিত প্রবাদ আছে-‘ভোটের মাঠে টাকা ওড়ে’। বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে এ প্রবাদটি এখন আর কেবল কথার কথা নয়, বরং এক রূঢ় ও নগ্ন বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। জাতীয় থেকে স্থানীয়-যে কোনো নির্বাচনে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা বা সাংগঠনিক ভিতের চেয়েও বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মানি ও মাসল পাওয়ার’। তবে যুগান্তরের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নির্বাচনি অর্থের অপচয় ও লুটপাটের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চরম অবক্ষয়ের পরিচায়ক। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে জয়ের নেশায় ধনাঢ্য প্রার্থীরা অকাতরে টাকা ঢাললেও সেই অর্থের সুবিধাভোগী সাধারণ ভোটার বা ত্যাগী কর্মীরা নন। বরং মাঝপথে সেই টাকার বেশির ভাগ আত্মসাৎ করছে প্রার্থীর চারপাশ ঘিরে থাকা সুযোগসন্ধানী ‘মধ্যস্বত্বভোগী’ বা দালালচক্র। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের ভাষ্যমতে, নির্বাচনি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়া এই লাগামহীন অর্থ ব্যয়ের অন্যতম কারণ। যখন সংসদ-সদস্য হওয়ার পথটি কেবল ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন সেখানে জনসেবার চেয়ে ‘বিনিয়োগ’ ও ‘মুনাফা’র প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠে। প্রার্থীরা নির্বাচনকে আদর্শিক লড়াইয়ের বদলে যখন অর্থের খেলায় পরিণত করেন, তখন সেখানে দালালচক্রের সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ চক্রটি যেমন প্রার্থীর অর্থ লুট করছে, তেমনই সাধারণ ভোটারদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কলুষিত করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের ভাষায়, দিনদিন যেভাবে নির্বাচনি ব্যয় বাড়ছে, তাতে সংসদ শেষ পর্যন্ত কেবল বিত্তবানদের ক্লাবে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। টাকা দিয়ে ভোট কেনার এই সংস্কৃতি একদিকে যেমন ভোটারদের মর্যাদা খাটো করে, অন্যদিকে প্রার্থীর চারপাশে থাকা সুবিধাভোগী চক্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

নির্বাচনকে দুর্বৃত্তায়নের এই ঘেরাটোপ থেকে বের করে আনতে হলে কেবল আইন করে নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারণ করে দিলেই হবে না, বরং তার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে কাগজে-কলমে ক্ষমতা দেখানোর বদলে মাঠপর্যায়ে ব্যয়ের উৎস ও খাত মনিটরিংয়ে সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর অর্থের চেয়ে ত্যাগ ও আদর্শকে প্রাধান্য দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। অন্যথায়, ভোটের মাঠে এই টাকার খেলা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আমাদের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে। আমরা চাই না নির্বাচন মানেই হোক লুটেরাদের মহোৎসব; বরং নির্বাচন হোক জনমত প্রতিফলনের প্রকৃত স্বচ্ছ মাধ্যম।

ট্যাগ :

আপনার মন্তব্য লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করুন

লেখক সম্পর্কে তথ্য

নির্বাচনি ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগী

প্রকাশিত সময় ০৩:৩৯:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
111

আমাদের দেশে একটি বহুলপ্রচলিত প্রবাদ আছে-‘ভোটের মাঠে টাকা ওড়ে’। বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে এ প্রবাদটি এখন আর কেবল কথার কথা নয়, বরং এক রূঢ় ও নগ্ন বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। জাতীয় থেকে স্থানীয়-যে কোনো নির্বাচনে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা বা সাংগঠনিক ভিতের চেয়েও বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মানি ও মাসল পাওয়ার’। তবে যুগান্তরের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নির্বাচনি অর্থের অপচয় ও লুটপাটের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল উদ্বেগজনকই নয়, বরং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চরম অবক্ষয়ের পরিচায়ক। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে জয়ের নেশায় ধনাঢ্য প্রার্থীরা অকাতরে টাকা ঢাললেও সেই অর্থের সুবিধাভোগী সাধারণ ভোটার বা ত্যাগী কর্মীরা নন। বরং মাঝপথে সেই টাকার বেশির ভাগ আত্মসাৎ করছে প্রার্থীর চারপাশ ঘিরে থাকা সুযোগসন্ধানী ‘মধ্যস্বত্বভোগী’ বা দালালচক্র। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের ভাষ্যমতে, নির্বাচনি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং কমিটি গঠনের সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়ন না হওয়া এই লাগামহীন অর্থ ব্যয়ের অন্যতম কারণ। যখন সংসদ-সদস্য হওয়ার পথটি কেবল ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন সেখানে জনসেবার চেয়ে ‘বিনিয়োগ’ ও ‘মুনাফা’র প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠে। প্রার্থীরা নির্বাচনকে আদর্শিক লড়াইয়ের বদলে যখন অর্থের খেলায় পরিণত করেন, তখন সেখানে দালালচক্রের সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ চক্রটি যেমন প্রার্থীর অর্থ লুট করছে, তেমনই সাধারণ ভোটারদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কলুষিত করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের ভাষায়, দিনদিন যেভাবে নির্বাচনি ব্যয় বাড়ছে, তাতে সংসদ শেষ পর্যন্ত কেবল বিত্তবানদের ক্লাবে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। টাকা দিয়ে ভোট কেনার এই সংস্কৃতি একদিকে যেমন ভোটারদের মর্যাদা খাটো করে, অন্যদিকে প্রার্থীর চারপাশে থাকা সুবিধাভোগী চক্রকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

নির্বাচনকে দুর্বৃত্তায়নের এই ঘেরাটোপ থেকে বের করে আনতে হলে কেবল আইন করে নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারণ করে দিলেই হবে না, বরং তার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে কাগজে-কলমে ক্ষমতা দেখানোর বদলে মাঠপর্যায়ে ব্যয়ের উৎস ও খাত মনিটরিংয়ে সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর অর্থের চেয়ে ত্যাগ ও আদর্শকে প্রাধান্য দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। অন্যথায়, ভোটের মাঠে এই টাকার খেলা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য আমাদের গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেবে। আমরা চাই না নির্বাচন মানেই হোক লুটেরাদের মহোৎসব; বরং নির্বাচন হোক জনমত প্রতিফলনের প্রকৃত স্বচ্ছ মাধ্যম।